নিবেদিতা স্মৃতি

বিশ্বনাথ দে

সম্প" দিত

পরিবেশক অনিবাণ প্রকাশনী ৩এ গঙ্ষধরপাৰ লেন

কণ্কা'্তা ১২

এশা্থাম কাশি ১লা আমান 1 ১৩০৭৭

প্রকাশক নিমলকুমাকস সাহা ১৮ বি, শ্যমাচকণ তে ইট ক্লিলকাত্ভতা-১২

গস চ্ছদ-চ্ত্ গাতুল বন্দোপাল্যাষ

বক, ছবি “* শ্রচ্হদ-সুক্রণ ন্যাশনাল হাকফিটোন তকোমস্প।নী ৬৮. আীত্ঞান্নাম ঘোষ জট কনিকাত্তা-৯

আন কব ক্বজতভকুসান সাম স্বাটাল শ্র্িশ্টৎ যাক ১১৬৫, €শাষাবাপান আ্রাউ কক্িকান্তা-৬

উৎসর্গ

ভগিনী নিবেদিভার একান্ত অনুরাী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু-অবলা বসুর স্মৃতির উদ্দেশ্যে-__

এই প্রসঙ্গে ভগিনী নিবেদিতা ভারতমাতার উদ্দেশ্টে স্বামী বিবেকানন্দের এক অনুপম উপহার স্বামী বিবেকানন্দ যেন তাকে পাশ্চাত্য সংস্কাতি সভ্যতার দৃঢ়মূল থেকে ছিন্ন করে এনে রোপণ করেছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতি সভ্যতার ভূমিতে

ভগিনী নিবেদিতা এমনই এক মহাপ্রাণ রমনী, যিনি বিদেশিনী হয়েও ভারতকে মাতৃভূমি জ্ঞান করে তার সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। জন্ম তার সুদূর আয়র্ল্যাণ্ডে ইংলণ্ডে লালিত-পালিত আর ভারগ্ত ছিল তার কর্মক্ষেত্র জীবন কর্মের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের অস্তভূরক্ত। তার আদর্শবাদ আত্মোৎসর্গ তাকে শাশ্বত জীবনের অধিকারী করেছিল

ভগিনী নিবেদিতার পিতা-মাতা ছিলেন ধর্মপ্রাণ খুষ্টান। জন্মক্ষণেই তার মাতা তাকে উৎসর্গ করেন ভগবং-সেবায়। ভগিনী নিবেদিতা স্বয়ং ছিলেন আত্মত্যাগ সত্যান্ুরাগ প্রভৃতি সদ্গুণে ভূষিতা। অপেক্ষা ছিল শুধু এক মহৎ প্রাণের জ্বলন্ত স্পর্শ__যে স্পর্শে তার অন্তরে আত্মত্যাগের স্ুপ্তবহি জলে উঠবে ১৮১৫ খুষ্টাকে লগুনে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাতে হলে তারই সুচনা

হহিন্দুযোগী'র সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের দ্বার। প্রভাবিত না হবার জঙ্ত সতর্কতা অবলম্বন এবং নিজের প্রবল স্বাতন্ত্বোধ সত্ত্বেও হিন্দুযোগীর চরিত্র শিক্ষার মহত্ব তাকে অভিভূত করে। তাই তিনি নিজেই এই সাক্ষাতের পরিণাম সম্বন্ধে লিখেছেন, “ইনি যে বীরোচিত উপাদানে গঠিত ছিলেন, তা আমি হদয়ঙ্গম করেছিলাম, এবং তার স্বজাতিপ্রেমের নিকট আমি সম্পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করতে চেয়েছিলাম

ভগিনী নিবেদিতা তার গুরুর নিকট যে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন, ভার উপর গুরুর অগাধ বিশ্বাস এবং যিনি তাকে কন্ঠারপে গ্রহণ করেন সেই শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদ-_ এই সকলের ফলেই তাঁর আদর্শের পথে, সাধনার পথে দৃঢ় পদক্ষেপ করা! সম্ভব

হয়েছিল। নানাভাবে তিনি ছুর্ভাগ| পরাধীন ভারতের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। ভারতের তরুণ সম্প্রদায়কে তিনি উদ্ধদ্ধ করেছিলেন দেশপ্রেমে, আহ্বান করেছিলেন ভারতমাতার মুক্তি-সাঁধনের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে ভারতীয় নারীর শিক্ষা উন্নতিকল্পে তিনি অনলস পরিশ্রম করে গেছেন। তদানীস্তভন ভারতের বহু জ্ঞানী-গণী-প্রতিভাবান মনীষী-ব্যক্তির উপর তিনি আপন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি--সর্বক্ষেত্রেই ছিল ভগিনী নিবেদিতার অবাধ পদসধ্চার।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও ভগিনী নিবেদিতা সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজনীতি ছিল আক্রমণশীল এবং আবেদন-নিবেদনমূলক নরমপন্থী রাজনীতি তিনি সহা করতে পারতেন না। তিনি ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেব নেতৃবৃন্দেব বন্ধু, কারণ তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভারতকে এক্যবদ্ধ হতে হবে। ভারতবর্ষে ধর্মের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হবে যখন সমগ্র জাতি কোন ছৃবলতা।, ছুর্ভাগ্য অথবা অভিযোগের দাবীতে নয়, পরস্ত এক মহান জাতীয়তা, এক উত্তরাধিকারের বিরাট সদা- জাগ্রত চেতনায় এক্যবদ্ধ হবে'__-এই ছিল তার স্বপ্ন

ভগিনী নিবেদিতার জীবন ছিল কঠোর ছুঃখ, পরীক্ষা কচ্ছ,সাধনাপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “সাহসের সঙ্গে বরণ কর তোমার নিজের অন্ধকার, তোমার দীপালোক বহুজনের অন্ধকার দূর করে আনন্দ দান করবে। তুচ্ছতম কাজটিও আনন্দের সঙ্গে সম্পাদন কর, বিসর্জন দাও উচ্চপদের আকাঙ্ষা

তাই, আজ আমাদের এই আকাজ্ষাসবস্ব, অবিন্যস্ত, এলোমেলো জীবনযাত্রার দিনে “নিবেদিতা-স্মৃতি' গ্রন্থ প্রকাশ করার প্রয়োজনবোধ দেখ! গেছে। এই মহিয়সী নারীর মহান নিবেদিত জীবন দেশের তকণ সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করুক--এই শুধু কামনা

বিশ্বনাথ দে

সৃচীপত্র গিরিশচন্দ্র ঘোষ। নিবেদিতার উদ্দেশ্যে স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতার উদ্দেশ্তটে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভগিনী নিবেদিতা জগদীশচন্দ্র বস্ত্র নিবেদিতা ১৮

ব্রজেন্দ্রনাথ শীল নিবেদিতা ১৯

অবল। বস্থ। নিবেদিতা ২০

যহনাথ সরকার। নিবেদিতার্‌ সঙ্গে বুদ্ধগষাঁষ। ২১ মতিলাল ঘোষ নিবেদিতা প্রসঙে | ২৩ রাসবিহারী ঘোষ। ভারত-কন্তা নিবেদিতা ২৫ সীতা দেবী। নিবেদিতা-রামানন্দ প্রসঙ্গে ২৭ বিপিনচন্দ্র পাল। প্রথম সাক্ষাতের স্থবৃতি। ২৯ জি. ভি. দেশমুখ। একটি দিনের স্থৃতিকথা ৬৩ এস. কে. র্যাটক্লিফ.। নিবেদিতা-স্থৃতি ৩৬ লেডি মিন্টো নিবেদিতার সঙ্গে সাক্ষাৎকার ৩৯ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মহিমাময়ী নিবেদিতা ৫৩ আনন্দ কুমাবন্ধামী নিবেদিতার কথা ৫৫ নন্দলাল বন্থু। নিবেদিতা-স্থৃতি ৫৬ অসিতকুমার হালদার ভগিনী নিবেদিতার স্মৃতিকথা ৫৮ স্বামী অভেদানন্দ। মিস মার্গারেট নোবল প্রসঙ্গে ৬৯ সরলাবাল! সরকার নিবেদিতা-স্মৃতি ৮১ বিনয়কুমার সরকার নিবেদিত1। ১৮৫ দীনেশচন্দ্র সেন। নিবেদিতার কথা ১৮৬ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় নিবেদিতা-স্মৃতি ১৯০ গোকুলচন্দ্র দে। তেজোময়ী নিবেদিতা ১৯৩ কুমুদবন্ধু সেন! নিবেদিতা-স্মতি ১৯৬ গিরিবালা ঘোষ পরমারাধ্য! নিবেদিতা ১৯৮

নির্ঝরিণী সরকার। ছোটবেলার স্মৃতি। ২০৩ প্রফুল্পমুখী দেবী। জননীসম। নিবেদিতা ২০৯ জীবন সাধন £ মণি বাগচী। জোড়ার্সাকো। ঠাকুরবাড়িতে নিবেদিতা ৪১ মোহিতলাল মজুমদার। তাঁপসী নিবেদিতা ৫৯ দিলীপকুমার রায়। দীপ্তিময়ী নিবেদিতা ৬১ সৌম্যেন্্রনাথ ঠাকুর। নিবেদিতা ৭৬ স্বামী সারদানন্দ। ভগিনী নিবেদিত ৭৯ প্রত্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা। মার্গারেট থেকে নিবেদিতা। ৯৯ শঙ্করীপ্রসাদ বস্থু। নিবেদিতা সম্পফিত স্বামীজীর কয়েকটি কবিতা ১১৭ গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী জাতীয় আন্দোলনে নিবেদিতা ১৩৩ উষ! দেবী সরম্বতী। নিবেদিতার জীবনে বিবেকানন্দের প্রভাব। ১৪৮ প্রত্রাজিক। নিরয়প্রাণা। গুরু শিষ্যা ১৭২ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ভগিনী নিবেদিতা ১৮১ প্রব্রাজিক! শ্রদ্ধাপ্রাণা। ভগিনী নিবেদিতা ২১১ প্রমথনাথ বিশী। নিবেদিতা ২১৬ পম্পা মিত্র। একটি বলিষ্ঠ আত্মনিবেদন। ২১৯ রমেশচন্দ্র মজুমদার ভগিনী নিবেদিতা ২৩৬ ভারতী রায়। সারদামণি নিবেদিতা ২৫৯ প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা। ভগিনী নিবেদিত ছাত্রসমাজ। ২৬৮ পরিশিষ্ট £ ভগিনী নিবেদিতা গুরু-বন্দনা। ২২৬ স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। আমেরিকায় বেদান্ত প্রচারে মাফ্িন নারী। ১৩৮ মিস ম্যাকলাউড মিসেস ওলি বুল। ২৫০

জীবন-পঞ্জী। ২৭৭

নিবেদিতার উদ্দেশ্টে গিরিশচন্দ্র ঘোষ

পবিভত্রা নিবেদিত। |

বংসে!

তুমি আমার নৃতন নাটক হইলে আনন্দ করিতে। আমার নূতন নাটক অভিনীত হইতেছে, তুমি কোথায়? দাজিলিও যাইবার সময় বলিয়া গিয়াছিলে, “আসিয়া যেন তোমায় দ্বেখিতে পাই

আমি জীবিত রহিয়াছি, কেন বসে, দেখা করিতে আইস না। শুনিতে পাই, মৃত্যুশয্যায় আমাকে স্মরণ করিয়াছিলে ; যদি দেবকার্ধে নিযুক্ত থাকিয়া কখনও আমায় তোমার স্মরণ থাকে, আমার অশ্রপুর্ণ এই উপহার গ্রহণ কর।

নিবেদিতার উদ্দেশ্যে স্বামী বিবেকানন্দ

আমার আদর্শ ছুই একটি কথায় বলা যাইতে পারে। মানুষের মধ্যে যে দেবত্ব আছে মনুয্য-সমাজে তাহ! প্রকাশ করা এবং জীবনের প্রতি পদক্ষেপে এই দেবত্ব কি ভাবে ফুটাইয়। তুলিতে পারা যায় তাহার উপায় নিরধারণ কর!

কুসংস্কারের শুৃঙ্খলে আবদ্ধ এই সংসার। পুরুষ হউক, নারী হউক, অত্যাচারিতের প্রতি আমি দয়! বোধ না করিয়া পারি না; আবার যে অত্যাচার করে তাহার প্রতিও আমার তেমনি করুণা।

আমি দিবালোকের মত স্পষ্ট দেখিতেছি যে, অজ্ঞতা হইতেই মানুষের যত ছুংখ-কষ্ট, অন্য কিছু হইতে নয়। পৃথিবীতে আলোর দিশারী কে হইবে? অতীতে আত্মোৎসর্গই ছিল নীতি। হায়, কত যুগ পরে আমর! আবার তাহা! ফিরিয়া পাইব? এই পৃথিবীর কল্যাণ সাধনের জন্য যাহারা সর্বাপেক্ষ। শ্রেষ্ঠ এবং সাহসী, তাহাদেরই আত্মোৎসর্গ করিবার দিন আজ। অনন্ত করুণা মৈত্রীতে পুর্ণ অসংখ্য বুদ্ধেরই আজ প্রয়োজন

বর্তমানে পৃথিবীর সকল ধর্মই প্রাণহীন, অসার। জগতে এখন চরিত্রবলেরই প্রয়োজন। জগৎ এমন সব মানুষ চাহিতেছে যাহাদের জীবন জ্বলন্ত, নিষ্কাম প্রেমের পুর্ণাহুতিস্বরূপ। সেই প্রেমের শক্তিতে উচ্চারিত বাক্যে বজ্বের মত কার্য করিবে।

আমার এই নিশ্চিত ধারণ! হইয়াছে যে, তোমার মন সর্বসংস্কার- মুক্ত; তোমার মধ্যে সেই শক্তি নিহিত আছে যাহা এই পৃথিবীকে নাড়া দিতে পারে। এই রকম আরে! অনেক মানুষ আসিবে আমি বলিষ্ঠ বাক্য, বলিষ্ঠতর কাজ। জাগো, জাগো মহাপ্রাণ! জগৎ যন্ত্রণায় জবলিয়! পুড়িয়া মরিতেছে। তোমার নিদ্রা যাইবার

স্বামী বিবেকানন্দ

অবসর কোথায়? যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আহ্বানে নিপ্রিত দেবত। জাগিয়া উঠিয়া সাড়া না দিতেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আহ্বান চলিবে। জীবনে আর কী দরকার! ইহা! অপেক্ষ। মহং কাজ পৃথিবীতে আর কি আছে?

আমি ভাবিয়া-চিন্তিয়া কাজ করি না, কাজ করিতে করিতে কাজের খুঁটিনাটি ঠিক করি। পরিকল্পনা-কথা ভাবি না। উহা আপন! হইতেই ঠিক হইয়! যায়। আমার কথা শুধু জাগো) জাগো !

আমার আশীর্বাদ সর্বক্ষণের জন্য তোমাকে ঘিরিয়া থাকুক।

ভগিনী নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা হয় তখন তিনি অল্পদিনমাত্র ভারতবর্ষে আসিয়াছেন। আমি ভাবিয়াছিলাম সাধারণত ইংরেজ মিশনরি মহিলারা যেমন হইয়। থাকেন ইনিও সেই শ্রেণীর লোক, কেবল ইহার ধর্মসম্প্রদায় স্বতন্ত্র।

সেই ধারণ আমার মনে ছিল বলিয়া আমার কন্যাকে শিক্ষা দিবার ভার লইবার জন্য তাহাকে অনুরোধ করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি শিক্ষা দিতে চাও? আমি বলিলাম, ইংরেজি, এবং সাধারণত ইংরেজি ভাষা অবলম্বন করিয়। যে শিক্ষা! দেওয়া হইয়া থাকে। তিনি বলিলেন, বাহির হইতে কোনো! একটা! শিক্ষা গিলাইয়। দিয়া লাভ কি? জাতিগত নৈপুণ্য ব্যক্তিগত বিশেষ ক্ষমতারূপে মানুষের ভিতরে যে জিনিসটা আছে তাহাকে জাগাইয়। তোলাই আমি যথার্থ শিক্ষা মনে করি। বাঁধা নিয়মের বিদেশী শিক্ষার দ্বারা সেটাকে চাপা দেওয়া আমার কাছে ভাল বোধ হয় না।

মোটের উপর তাহার এই মতের সঙ্গে আমার মতের অনৈক্য ছিল না। কিন্ত কেমন করিয়। মানুষেয় ঠিক স্বকীয় শক্তি কৌলিক প্রেরণাকে শিশুর চিত্তে একেবারে অস্কুরেই আবিষ্কার কর! যায় এবং তাহাকে এমন করিয়। জাগ্রত কর! যায় যাহাতে তাহার নিজের গভীর বিশেষত্ব সার্বভৌমিক শিক্ষার সঙ্গে ব্যাপকভাবে সুসঙ্গত হইয়া উঠিতে পারে তাহার উপায় জানি না। কোনো অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন গুর কাজ নিজের সহজবোধ হইতে করিতেও পারেন, কিন্ত ইহ! সাধারণ শিক্ষকের কর্ম নহে। কাজেই আমরা প্রচলিত শিক্ষাপ্রণালী অবলম্বন করিয়া মৌটারকমে কাজ চালাই। তাহাতে

রবীজ্নাথ ঠাকুর

অন্ধকারে ঢেল! মারা হয়-_-তাহাতে অনেক ঢেলার অপব্যয় হয়ঃ এবং অনেক ঢেল। ভুল জায়গায় লাগিয়া! ছাত্র বেচারাকে আহত করে। মানুষের মত চিন্তবিশিষ্ট পদার্থকে লইয়া এমনতর পাইকারীভাবে ব্যবহার করিতে গেলে প্রভূত লোকসান হইবেই সন্দেহ নাই, কিন্ত সমাজে সর্বত্র তাহ! প্রতিদিনই হইতেছে।

যদিচি আমার মনে সংশয় ছিল, এরূপ শিক্ষ। দিবার শক্তি তাহার আছে কি না, তবু আমি তাহাকে বলিলাম, আচ্ছা, বেশ আপনার নিজের প্রণালীমতই কাজ কদ্ধিবেন, আমি কোনে। প্রকার ফরমাস করিতে চাই না। বোধ করি ক্ষণকালের জন্ত তাহার মন অনুকূল হইয়াছিল, কিন্তু পরক্ষণেই বলিলেন, না, আমার কাজ নহে। বাগবাজারের একটি বিশেষ গলির কাছে তিনি আত্মনিবেদন করিয়া ছিলেন__সেখানে তিনি পাড়ার মেয়েদের মাঝখানে থাকিয়। শিক্ষ। দিবেন তাহা নহে, শিক্ষা জাগাইয়। তুলিবেন। মিশনরির মত মাথ৷ গণন। করিয়া দলবৃদ্ধি করিবার স্থুযোগকে, কোনো একটি পরিবারের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তারের উপলক্ষ্যকে, তিনি অবজ্ঞ৷ করিয়! পরিহার করিলেন।

তাহার পরে মাঝে মাঝে নানাদিক দিয়! ক্তাহার পরিচয়লাভের অবসর আমার ঘটিয়াছিল। তাহার প্রবল শক্তি আমি অনুভব করিয়াছিলাম, কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও বুঝিয়াছিলাম তাহার পথ আমার চলিবার পথ নহে। তীহাঁর সর্বতোমুখী প্রতিভ। ছিল, সেই সঙ্গে তাহার আর একটি জিনিস ছিল, সেটি তাহার যোদ্ৃত্ব। তাহার বল ছিল এবং মেই বল তিনি অন্যের জীবনের উপর একান্ত বেগে প্রয়োগ করিতেন-_মনকে পরাভূত করিয়া অধিকার করিয় লইবার একটা! বিপুল উৎসাহ তাহার মধ্যে কাজ করিত। যেখানে তাহাকে মানিয়া চলা অসম্ভব সেখানে তাহার সঙ্গে মিলিয়া চল! কঠিন ছিল। অন্তত আমি নিজের দিক দিয়া বলিতে পারি তাহার সঙ্গে আমার মিলনের নানা অবকাশ ঘটিলেও এক জায়গায় অন্তরের মধ্যে আমি

ভগিনী নিবেদিতা

গভীর বাধ। অন্থুভব করি্তাম। সেষেঠিক মতের অনৈক্যের বাধ! তাহা নহে, সে যেন একটা! বলবান আক্রমণের বাধ!

আজ এই কথ! আমি অসষ্কোচে প্রকাশ করিতেছি তাহার কারণ এই যে, একদিকে তিনি আমার চিত্বকে প্রতিহত করা সত্বেও আর একদিকে তাহার কাছ হইতে যেমন উপকার পাইয়াছি এমন আর কাহারো কাছ হইতে পাইয়াছি বলিয়া মনে হয় না। তাহার সহিত পরিচয়ের পর হইতে এমন বারম্বার ঘটিয়াছে যখন তাহার চরিত স্মরণ করিয়া ত্বাহার প্রতি গভীর ভক্তি অনুভব করিয়া আমি প্রচুর বল পাইয়াছি।

নিজেকে এমন করিয়া সম্পূর্ণ নিবেদন করিয়া দিবার আশ্চর্য শক্তি আর কোনো! মানুষে প্রত্যক্ষ করি নাই। সে সম্বন্ধে তাহার নিজের মধ্যে যেন কোনে' প্রকার বাধাই ছিল না। তাহার শরীর, তাহার আশৈশব ফুরোগীয় অভ্যাস, তাহার আত্মীয় স্বজনের স্মেহমমতা, তাহার ব্বদেশীয় সমাজের উপেক্ষা এবং যাহাদের জন্য তিনি প্রাণ সমর্পণ করিয়াছেন তাহাদের ওদাসীন্য, হূর্বলতা ত্যাগ- স্বীকারের অভাব কিছুতেই তাহাকে ফিরাইয়া দিতে পারে নাই। মানুষের সত্যরূপ, চিতরূপ যে কি, তাহা যে তাহাকে জানিয়াছে সে দেখিয়াছে। মানুষের আস্তরিক সত্তা সর্ব প্রকার স্থল আবরণকে একেবারে মিথ্যা করিয়া দিয়া কিরূপ অপ্রতিহত তেজে প্রকাশ পাইতে পারে তাহ! দেখিতে পাওয়া পরম সৌভাগ্যের কথা ভগিনী নিবেদিতার মধ্যে মানুষের সেই অপরাহত মাহাত্ম্যকে সম্মুখে প্রত্যক্ষ করিয়া আমরা ধন্য হইয়াছি। রঃ

পৃথিবীতে সকলের চেয়ে বড় জিনিস আমরা যাহা কিছু পাই তাহা বিনামূল্যেই পাইয়া থাকি, তাহার জন্য দরদস্তর করিতে হয় না মূল্য চুকাইতে হয় ন! বলিয়াই জিনিসট। যে কত বড় তাহা আমরা সম্পূর্ণ বুঝিতেই পারি না। «ভগিনী নিবেদিতা আমাদিগকে যে জীবন দিয়া গিয়াছেন তাহা! অতি মহতজীবন ;_-তাহার দিক হইভে,

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তিনি কিছুমাত্র ফাঁকি দেন নাই + প্রতিদিন প্রতি মুহুর্তেই আপনার যাহা সকলের শ্রেষ্ঠ, আপনার যাহা মহত্বম, তাহাই তিনি দান করিয়াছেন, সে জন্য মানুষ যত প্রকার কৃচ্ছ সাধন করিতে পাঁরে সমস্তই তিনি স্বীকার করিয়াছেন। এই কেবল তাহার পণ ছিল যাহা একেবারে খাঁটি তাহাই তিনি দিবেন-_নিজেকে তাহার সঙ্গে একটুও মিশাইবেন না__নিজের ক্ষুধাতৃষ্ণা, লাভলোকসান, খ্যাতি- প্রতিপত্তি কিছু না__-ভয় না, সঙ্কোচ না, আরাম না বিশ্রাম না।

এই যে এতবড় আত্মবিসর্জন আমর! ঘরে বসিয়। পাইয়াছি ইহাকে আমরা যে অংশে লঘু করিয়া দেখিব সেই অংশেই বঞ্চিত হইব, পাইয়াও আমাদের পাওয়। ঘটিবে ন7া। এই আত্মবিসর্জনকে অত্যন্ত অসস্কোর্চে নিতান্তই আমাদের প্রাপ্য বলিয়। অচেতনভাবে গ্রহণ করিলে চলিবে না। ইহার পশ্চাতে কত বড় একটা শক্তি, ইহ।র সঙ্গে কি বুদ্ধি, কি হৃদয়, কি ত্যাগ, প্রতিভার কি জ্যোতির্ময় অন্তর্দৃষ্টি আছে তাহ! আমাদিগকে উপলব্ধি করতে হইবে |

যদি তাহা উপলব্ধি করি তবে আমাদের গর্ব দূর হইয়া যাইবে। কিন্তু এখনো আমর! গর করিতেছি। তিনি যে আপনার জীবনকে এমন করিয়া দান করিয়াছেন সেদিক দিয়া তাহার মাহাত্ম্যকে আমরা সে পরিমাণে মনের মধ্যে গ্রহণ করিতেছি না, যে পরিমাণে এই ত্যাগস্বীকারকে আমাদের গর্ব করিবার উপকরণ করিয়া! লইয়াছি। আমরা বলিতেছি তিনি অন্তরে হিন্দু ছিলেন, অতএব আমর! হিন্দুরা বড় কম লোক নই। তাহার যে আত্মনিবেদন তাহাতে আমাদেরই ধর্ম সমাজের মহত্ব এমনি করিয়া আমরা নিজের দিকের দাবিকেই যত বড় করিয়া লইতেছি তাহার দিকের দানকে ততই খর্ব করিতেছি।

বস্তুত তিনি কি পরিমাণে হিন্দু ছিলেন তাহা আলোচনা করিয়া দেখিতে গেলে নান! জায়গায় বাঁধ। পাইতে হইবে _অর্থা আমরা হিন্দুয়ানির যে ক্ষেত্রে আছি তিনিও ঠিক সেই ক্ষেত্রেই ছিলেন একথা আমি সত্য বলিয়া মনে করি না। তিনি হিন্দুধর্ম হিন্দুসমাঁজকে

তগিনী নিবেদিতা

যে এঁতিহাসিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখিতেন-_ তাহার শাস্ত্রীয় অপৌরুষেয় অটল বেড়া ভেদ করিয়া! যেরূপ সংস্কারমুক্ত চিত্তে তাহাকে নান। পরিবর্তন অভিব্যক্তির মধ্য দিয়া চিন্তা কল্পনার দ্বারা অনুুমরণ করিতেন, আমরা যদি সে পম্থা। অবলম্বন করি তবে বর্তমান- কালে যাহাকে সর্বসাধারণে হিন্দুয়ানি বলিয়া থাকে তাহার ভিত্তিই ভাঙিয় যায়। এঁতিহাসিক যুক্তিকে যদি পৌরাণিক উক্তির চেয়ে বড় করিয়। তুলি তবে তাহাতে সত্য নির্ণয় হইতে পারে কিন্তু নিবিচার বিশ্বাসের পক্ষে তাহা অনুকূল নহে।

যেমনি হৌক, তিনি হিন্দু ছিলেন বলিয় নহে, তিনি মহৎ রে বলিয়াই আমাদের প্রণম্য। তিনি আমাদেরই মতন ছিলেন বলিয়! তাহাকে ভক্তি করিব তাহা নহে, তিনি আমাদের চেয়ে ঝড় ছিলেন বলিয়াই তিনি আমাদের ভক্তির যোগ্য সেইদিক দিয়া যদি তাহার চরিত আলোচনা করি তবে, হিন্দুত্বের নহে, মনুষ্যত্বের টি আমর! গৌরবান্বিত হইব।

তাহার জীবনে সকলের চেয়ে যেট1 চক্ষে পড়ে টো এই ষে, তিনি যেমন গভীরভাবে ভাবুক তেমনি প্রবলভাবে কম ছিলেন। কর্মের মধ্যে একটা অসম্পূর্ণতা আছেই-কেন না তাহাকে বাধার মধ্য দিয়। ক্রমে ক্রমে উত্ভিন্ন হইয়া উঠিতে হয়--সেই বাধার নান! ক্ষতচিহ্ব তাহার স্থষ্টির মধ্যে থাকিয়া! যায়। কিন্তু ভাব জিনিসটা অক্ষু্ন অক্ষত। এই জন্য যাহারা ভাববিলাসী তাহার৷ কর্ণকে অবজ্ঞ! করে অথবা ভয় করিয়া থাকে তেমনি আবার বিশুদ্ধ কেজেো লোক আছে তাহ।রা ভাবের ধার ধারে না, তাহার। কর্মের কাছ হইতে খুব বড় জিনিস দাবি করে না৷ বলিয়৷ কর্মের কোনে অসম্পূর্ণতা তাহাদের হৃদয়কে আঘাত করিতে পারে না।

কিন্তু ভাবুকতা৷ যেখানে বিলাসমাত্র নহে, যেখানে তাহ সত্য, এবং কর্ম যেখানে প্রচুর উদ্মের প্রকাশ বা সাংসারিক প্রয়োজনের সাধনা- মাত্র নহে, যেখানে তাহা ভাবেরই স্থপ্টি, সেখানে তুচ্ছও কেমন বড়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হইয়া উঠে এবং অসম্পূর্ণতাও মেঘপ্রতিহত সূর্যের বণ্চ্ছটার মত কিরূপ সৌন্দর্যে প্রকাশমান হয় তাহা ভগিনী নিবেদিতার কর্ম ধাহারা আলোচন। করিয়া দেখিয়াছেন তাহার। বুঝিয়াছেন।

ভগিনী নিবেদিতা যেসকল কাজে নিযুক্ত ছিলেন তাহার কোনটারই আয়তন বড় ছিল না, তাহার সকলগুলিরই আবন্ত ক্ষুত্র। নিজের মধ্যে যেখানে বিশ্বীস কম, সেখানেই দেখিযাছি বাঁহিবের বড় আয়তনে সাম্তবনা লাভ করিবার একটা ক্ষুধা থাকে। ভগিনী নিবেদিতার পক্ষে তাহা একেবারেই সম্ভবপর ছিল না। তাহার প্রধান কাবণ এই যে তিনি অত্যন্ত খাঁটি ছিলেন। যেটুকু সত্য তাহাই তাহার পক্ষে একেবাবে যথেষ্ট ছিল, তাহাকে আকাবে বড় করিয়া! দেখাইবাব জন্য তিনি লেশমাত্র প্রয়োজন বোধ করিতেন না, এবং তেমন করিয়া বড় করিয়। দেখাইতে হইলে যেসকল মিথ্য। মিশাল দিতে হয় তাহ। তিনি অন্তরের সহিত ঘ্বণা করিতেন _ এইজন্ই এই একটি আশ্চয দৃশ্য দেখা গেল, যাহার এমন অসামান্য স্রিক্ষা প্রতিভা তিনি এক গলির কোণে বৌ কর্মক্ষেত্র বাছিয়া লইলেন তাহা পৃথিবীব লোকের চোখে পড়িবার মত একেবারেই নহে। বিশাল বিশ্বপ্রকৃতি যেমন তাহার সমস্ত বিপুল শক্তি লইয়। মাটির নীচেকার অতি ক্ষুদ্র একটি বীজকে পালন করিতে অবজ্ঞা কবে না এও সেইকপ | তাহাব এই কাজটিকে তিনি বাহিরে কোনোদিন ঘোষণা করেন নাই এবং আামাদের কাহাবও নিকট হইতে কোনোদিন ইহার জন্ত তিনি অর্থ সাহায্য প্রত্যাশাও করেন নাই। তিনি যে ইহার ব্যয় বহন কবিয়াছেন তাহ চাদার টাকা হইতে নহে, উদ্ব-্ত অর্থ হইতে নহে, একেবারেই উদরাম্নের অংশ হইতে।

তাহা শক্তি শল্প বলিয়াই যে তাহার অনুষ্ঠান ক্ষুদ্র ইহা! সত্য নহে।

একথ। মনে রাখিতে হইবে ভগিনী নিবেদিতাঁর যে ক্ষমতা ছিল তাহাতে তিনি নিজের দেশে অনায়াসেই প্রতিষ্ঠালাভ করিতে

১০ _ ভগিনী নিবেদিত!

পারিতেন। তাহার যে-কোনো স্বদেশীয়ের নিকটসংস্রবে তিনি আসিয়াছেন সকলেই তাহার প্রবল চিত্বশক্তিকে স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন। দেশের লোকের নিকট যে খ্যাতি তিনি জয় করিয়া লইতে পারিতেন সেদিকে তিনি দৃক্পাতও করেন নাই।

তাহার পর এদেশের লোকের মনে আপনার ক্ষমতা বিস্তার করিয়া এখানেও তিনি যে একট। প্রধান স্থান অধিকার করিয়া লইবেন সে ইচ্ছাও তাহার মনকে লুদ্ধ করে নাই। অন্ত মুরোগীয়কেও দেখ! গিয়াছে ভারতবর্ষের কাজকে তাহারা নিজের জীবনের কাজ বলিয়া বরণ করিয়া! লইয়াছেন, কিন্ত তাহার! নিজেকে সকলের উপরে রাখিতে চেষ্টা করিয়াছেন-_তাহার৷ শ্রদ্ধাপূর্বক আপনাকে দান করিতে পারেন নাই-_তাহাদের দানের মধ্যে এক জায়গায় আমাদের প্রতি অনুগ্রহ আছে। কিন্ত শ্রদ্ধয়া দেয়ম্‌, অশ্রদ্ধয়। অদেয়ম। কারণ, দক্ষিণ হস্তের দানের উপকারকে বাম হস্তের অবজ্ঞা অপহরণ করিয়া লয়।

কিন্ত ভগিনী নিবেদিতা একান্ত ভালবাসিয়া সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে ভারতবর্ষে দান করিয়াছিলেন, তিনি নিজেকে কিছুমাত্র হাতে রাখেন নাই। অথচ নিতান্ত মৃছুস্ভাবের লোক ছিলেন বলিয়াই যে নিতান্ত ছুর্লভাবে তিনি আপনাকে বিলুপ্ত করিয়াছিলেন তাহা নহে। পূর্বেই কথার আভাস দিয়াছি তাহার মধ্যে একট ছর্দাস্ত জোর ছিল, এবং সে জোর যে কাহারও প্রতি প্রয়োগ করিতেন না তাহাও নহে। তিনি যাহা চাঁহিতেন তাহা সমস্ত মন প্রাণ দিয়াই চাহিতেন এবং ভিন্ন মতে বা! প্রকৃতিতে যখন বাধ। পাইত তখন তাহার অসহিষুতাও যথেষ্ট উগ্র হইয়া উঠিত। তাহার এই পাশ্চাত্য- স্বভাবসুলভ প্রতাপের প্রবলত। কোন অনিষ্ট করিত না৷ তাহা আমি মনে করি না_কারণ, যাহা। মানুষকে অভিভূত করিতে চেষ্টা করে তাহাই মানুষের শক্র--তৎসত্বেও বলিতেছি, তাহার উদার মহত্ব তাহার উদগ্র প্রবলতাকে অনেক দুরে ছাড়াইয়া শিয়াছিল। তিনি

রবীজনাথ ঠাকুর ১১

যাহা ভাল মনে করিতেন তাহাকেই জয়ী করিবার জন্য তাহার সমস্ত জোর দিয়া লড়াই করিতেন, সেই জয়গৌরব নিজে লইবার লোভ তাহার লেশমাত্র ছিল না। দল বাঁধিয়৷ দলপতি হইয়। উঠা তাহার পক্ষে কিছুই কঠিন ছিল না, কিন্তু বিধাতা তাহাকে দলপতির চেয়ে অনেক উচ্চ আসন দিয়াছিলেন, আপনার ভিতরকার সেই সত্যের আসন হইতে নামিয়া তিনি হাটের মধ্যে মাচা বাধেন নাই। এদেশে তিনি তাহার জীবন রাখিয়া গিয়াছেন কিন্ত দল রাখিয়া যান নাই

অথচ তাহার কারণ নয় যে, তাহার মধ্যে রুচিগত বা বুদ্ধিগত আভিজাত্যের অভিমান ছিল ;_-তিনি জনসাধারণকে অবজ্ঞা করিতেন বলিয়াই যে তাহাদের নেতার পদের জন্য উমেদ।রী করেন নাই তাহা নহে। জনসাধারণকে হৃদয় দান করা যে কত বড় সত্য জিনিস তাহা তাহাকে দেখিয়াই আমরা শিখিয়াছি। জনসাধারণের প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে আমাদের যে বোধ তাহা পুঁথিগত _ সম্বন্ধে আমাদের বোধ কর্তব্যবুদ্ধির চেয়ে গভীরতায় প্রবেশ করে নাই। কিন্তু মা যেমন ছেলেকে সুস্পষ্ট করিয়া জানেন, ভগিনী নিবেদিতা জন- সাধারণকে তেমনি প্রত্যক্ষ সত্তারূপে উপলব্ধি করিতেন। তিনি এই বৃহৎ ভাবকে একটি বিশেষ ব্যক্তির মতই ভালবাসিতেন। তাহার হৃদয়ের সমস্ত বেদনার দ্বারা তিনি এই “্পীপ ল্*কে এই জনসাধাবণকে আবৃত করিয়া ধরিয়াছিলেন। যদি একটিমাত্র শিশু হইত তবে ইহাকে তিনি আপনার কোলের উপর রাঁখিয়! আপনার জীবন দিয়া মানুষ করিতে পারিতেন।

বস্তুত তিনি ছিলেন লোকমাত1। যে মাতৃভাব পরিবারের বাহিরে একটি সমগ্র দেশের উপরে আপনাকে ব্যাপ্ত করিতে পাঁরে তাহার মৃত্তি ইতিপূর্বে আমর! দেখি নাই সম্বন্ধে পুরুষের যে কর্তব্যবোধ তাহার কিছু কিছু আভাস পাইয়াছি, কিন্ত রমণীর যে পরিপূর্ণ মমত্ব- বোধ তাহা! প্রত্যক্ষ করি নাই। তিনি যখন বলিতেন 0: 0901316

১২ ভগিনী নিবেদিতা

তখন তাহার মধ্যে যে একান্ত আত্মীয়তার স্থুরটি লাগিত আমাদের কাহারো কণ্ঠে তেমনি লাগে না। ভগিনী নিবেদিত দেশের মান্থষকে যেমন সত্য করিয়া ভালবাসিতেন তাহ1 যে দেখিয়াছে সে নিশ্চয়ই ইহা! বুঝিয়াছে যে, দেশের লৌককে আমরা হয় সময় দিই, অর্থ দিই, এমন কি, জীবনও দিই কিন্ত তাহাকে হৃদয় দিতে পারি নাই__তাহাকে তেমন অত্যন্ত সত্য করিয়। নিকট করিয়। জানিবার শক্তি আমব। লাভ করি নাই।

আমর। যখন দ্রেশ ব। বিশ্বমানব বা এরূপ কোনে। একটি সমষ্টিগত সত্তাকে মনের মধ্যে দেখিতে চেষ্টা করি তখন তাহাকে যে অত্যন্ত অস্পষ্ট করিয়া! দেখি তাহাব কাবণ আছে। আমরা এইরূপ বৃহৎ ব্যাপক সত্তকে কেবলমাত্র মন দিয়াই দেখিতে চাই, চোখ দিয়! দেখি না। যে লোক দেশের প্রত্যেক লোকের মধ্যে সমগ্র দেশকে দেখিতে পায় না সে মুখে যাহাই বলুক দেশকে যথার্থভাবে দেখে না। ভগিনী নিবেদিতাকে দেখিয়াছি তিনি লোক-সাধারণকে দেখিতেন, স্পর্শ কবিতেন, শুদ্ধমাত্র তাহাকে মনে মনে ভাবিতেন না তিনি গণডগ্রামের কুটাববাঁসিনী একজন সামান্য মুসলমান রমণীকে যেবপ অকৃত্রিম শ্রদ্ধার সহিত সম্ভাষণ করিয়াছেন দেখিয়াছি, সামান্য লোকের পক্ষে তাহা সম্ভবপব নহে -কারণ ক্ষুদ্র মানুষের মধ্যে বৃহৎ মানুষকে প্রত্যক্ষ করিবার সেই দৃষ্টিঃ সে অতি অসাধারণ। সেই দৃষ্টি তাহার পক্ষে অত্যন্ত সহজ ছিল বলিয়াই এতদিন ভারতবর্ষের এত নিকটে বাস করিয়া তাহাব শ্রদ্ধা ক্ষয় হয় নাই।

লোকসাধারণ ভগিনী নিবেদিতার হাদয়ের ধন ছিল বলিয়াই তিনি কেবল দূর হইতে তাহাদের উপকার করিয়। অনুগ্রহ করিতেন না। তিনি তাহাদের সংশ্রব চাহিতেন, তাহাদিগকে সবতোভাবে জাঁনিবার জন্ত তিনি তাহার সমস্ত মনকে তাহাদের দিকে প্রসারিত করিয়া দিতেন। তিনি তাহাদের ধর্মকর্ম কথাকাহিনী পুজাপদ্ধতি শিল্পসাহিত্য তাহাদের জীবনযাত্রার সমস্ত বৃত্তান্ত কেবল বুদ্ধি দিয়! নয়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩,

আন্তরিক মমতা দরিয়। গ্রহণ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। তাহার মধ্যে যাহা কিছু ভাল, যাহ। কিছু সুন্দর, যাহ কিছু নিত্য পদার্থ আছে তাহাকেই তিনি একাস্ত আগ্রহের সঙ্গে খুজিয়াছেন। মানুষের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধা এবং একটি গভীর মাতৃন্সেহ বশতই তিনি এই ভালটিকে বিশ্বাস করিতেন এবং ইহাকে খু'ঁজিয়। বাহির করিতে পারিতেন। এই আগ্রহের বেগে কখনও তিনি ভুল করেন নাই তাহা নয়, কিন্তু শ্রদ্ধার গুণে তিনি যে সত্য উদ্ধার করিয়াছেন সমস্ত ভুল তাহার কাছে তুচ্ছ। ধাহার! ভাল শিক্ষক তাহারা সকলেই জানেন শিশুর স্বভাবের মধ্যেই প্রকৃতি একটি শিক্ষা করিবাব সহজ প্রবৃত্তি নিহিত করিয়া রাখিয়! দিয়াছেন ; শিশুদের চঞ্চলতা, অস্থির কৌতুহল, তাহাদের খেলাধূলা সমস্তই প্রাকৃতিক শিক্ষাপ্রণালী ; জনসাধারণের মধ্যে সেই প্রকারের একটি শিশুত্ব আছে। এইজন্য জনসাধারণ নিজেকে শিক্ষা দিবার সাস্ত্বনা দিবার নানাপ্রকার সহজ উপায় উদ্ভাবন করিয়াছে ছেলেদের ছেলেমানুষী যেমন নিরর্৫থক নহে তেমনি জনসাধারণের নানাপ্রকার সংস্কার প্রথা নিরবচ্ছিন্ন মূঢ়তা নহে-_তাহা! আপনাকে নানাপ্রকারে শিক্ষা দিবার জন্য জনসাধারণের অন্তনিহিত চেষ্টা__তাহাই তাহাদের স্বাভাবিক শিক্ষার পথ। মাতৃ- হৃদয়। নিবেদিতা জনসাধারণের এই সমস্ত আচার ব্যবহারকে সেইদিক হইতে দেখিতেন। এইজন্য সেই সকলের প্রতি তাহার ভারি একট! স্নেহ ছিল। তাহার সমস্ত বাহ্রূঢত। ভেদ করিয়া তাহার মধ্যে মানবপ্রকতির চিরন্তন গৃঢ় অভিপ্রীয় তিনি দেখিতে পাইতেন। লোকসাধারণের প্রতি তাহার এই যে মাতৃস্সেহ তাহা একদিকে যেমন সকরুণ স্বকোমল আর একদিকে তেমনি শাবকবেষ্টিত বাধিনীর মত প্রচণ্ড। বাহির হইতে নির্মমভাবে কেহ ইহাদিগকে কিছু নিন্দা করিবে সে তিনি সহিতে পারিতেন না-_অথব। যেখানে রাজার কোনে! অন্যায় অবিচার ইহাদিগকে আঘাত করিতে উদ্যত হইত সেখানে তাহার তেজ প্রদীপ্ত হইয়া উঠিত। কত লোকের কাছ

১৪ ভগিনী নিবেদিতা

হইতে তিনি কত নীচত৷ বিশ্বাসঘাতকত৷ সহা করিয়াছেন, কত লোক তাহাকে বঞ্চনা করিয়াছে, তাহার অতি সামান্য সম্বল হইতে কত নিতান্ত অযোগ্যলোকের অসঙ্গত আবদার তিনি রক্ষা করিয়াছেন, মস্তই তিনি অকাতরে 'সহা করিয়াছেন ; কেবল তাহার একমাত্র ভয় এই ছিল পাছে তাহার নিকটতম বন্ধুরাও এই সকল হীনতার দৃষ্টান্তে তাহার “লীপ.ল”দের প্রতি অবিচার করে। ইহাদের যাহা কিছু ভাল তাহা যেমন তিনি দেখিতে চেষ্টা করিতেন তেমনি অনাত্মীয়ের অশ্রদ্ধা- দৃষ্টিপাত হইতে ইহাদ্িগকে রক্ষা করিবার জন্য তিনি যেন তাহার সমস্ত ব্যথিত মাতৃহদয় দিয়া ইহাদ্দিগকে আবৃত করিতে চাহিতেন। তাহার কারণ নয় যে সত্য গোপন করাই তাহার অভিপ্রায় ছিল, কিন্তু তাহার কারণ এই যে তিনি জানিতেন, অশ্রদ্ধার দ্বারা ইহাদিগকে আপমান কর! অত্যন্ত সহজ এবং স্থুলদৃষ্টি লোকের পক্ষে তাহাই সম্ভব কিন্ত ইহাদের অন্তঃপুরের মধ্যে যেখানে লক্ষ্মী বাস করিতেছেন সেখানে এই সকল শ্রদ্ধাহীন লোকের প্রবেশের অধিকার নাই-_ এইজন্যই তিনি এই সকল বিদেশীয় দিঙনাগদের “্ুলহস্তাবলেপ” হইতে তাহার এই আপন লোকদ্দিগকে রক্ষা করিবার জন্য এমন ব্যাকুল হইয়া উঠিতেন, এবং আমাদের দেশের যেসকল লোক 'বিদেশীর কাছে এই দীনতা! জনাইতে যায় যে, আমাদের কিছুই নাই এবং তোমরাই আমাদের একমাত্র আশাভরসা, তাহাদিগকে তিনি তাহার তীবত্ররোষের বজ্রশিখার দ্বার বিদ্ধ করিতে চাহিতেন।

এমন যুরোপীয়ের কথা শেঠ যায় ধাহারা আমাদের শাস্ত্র পড়িয়া, বেদাস্ত আলোচনা! করিয়া, আমাদের কোনে! সাধুসজ্জনের চরিত্রে বা আলাপে আকৃষ্ট হইয়া! ভারতবর্ষের প্রতি ভক্তি লইয়া! আমাদের নিকটে আসিয়াছেন ; অবশেষে দিনে দিনে সেই ভক্তি বিসর্জন দিয়া রিক্ত হস্তে দেশে ফিরিয়াছেন। তাহার! শাস্ত্রে যাহা পড়িয়াছেন সাধুচ়রিতে যাহা দেখিয়াছেন সমস্ত দেশের দৈন্ত অসম্পূর্ণতার আবরণ ভেদ করিয়। তাহা! দেখিতে পান নাই। . তাহাদের যে ভক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৫

সে মোহমাত্র, সেই মোহ অন্ধকারেই টি'কিয়া থাকে, আলোকে আসিলে মরিতে বিলম্ব করে ন|।

কিন্তু ভগিনী নিবেদিতার যে শ্রদ্ধা তাহ। সত্যপদার্থ, তাহা মোহ নহে-__তাহা! মানুষের মধ্যে দর্শনশাস্ত্রের শ্লোক খুঁজিত না, তাহা! বাহিরের সমস্ত আবরণ ভেদ করিয়! মর্মস্থানে পৌছিয়া একেবারে মনুষ্যত্বকে স্পর্শ করিত। এইজন্য অত্যন্ত দীন অবস্থার মধ্যেও আমাদের দেশকে দেখিতে তিনি কুষ্িত হন নাই। সমস্ত দৈম্তই তাহার স্েহকে উদ্বোধিত করিয়াছে, অবজ্ঞাকে নে। আমাদের আচার ব্যবহার, কথাবার্তা, বেশভৃষা, আমাদের প্রাত্যহিক ক্রিয়া- কলাপ একজন যুরোপীয়কে যে কিরূপ অসহাভাবে আঘাত করে তাহা আমর! ঠিকমত বুঝিতেই পারি নাঃ এইজন্য আমাদের প্রতি তাহাদের রূঢতাকে আমরা সম্পূর্ণ অহেতুক বলিয়া মনে করি। কিন্তু ছোট ছোট রুচি, অভ্যাস সংস্কারের বাধা যে কত বড় বাধা তাহা একটু বিচার করিয়া দেখিলেই বুঝিতে পারি, কারণ, নিজেদের দেশের ভিন্ন শ্রেণী ভিন্ন জাতির সম্বন্ধে আমাদের মনেও সেট! অত্যন্ত প্রচুর পরিমাণেই আছে। বেড়ার বাধার চেয়ে ছোট ছোট কাটার বাধা বড় কম নহে। অতএব কথ! আমাদিগকে মনে রাখিতে হইবে ভগিনী নিবেদিতা কলিকাতার বাঙালীপাড়ার এক গলিতে একেবারে আমাদের ঘরের মধ্যে আসিয়া যে বাস করিতেছিলেন তাহার দিনে রাত্রে প্রতি মুহুর্তে বিচিত্র বেদনার ইতিহাস প্রচ্ছন্ন ছিল। এক প্রকার স্থুলরুচির মানুষ আছে তাহাদিগকে অল্প কিছুতেই স্পর্শ করে না তাহাদের অচেতনতাই তাহাদিগকে অনেক আঘাত হইতে রক্ষা! করে। ভগিনী নিবেদিত একেবারেই তেমন মানুষ ছিলেন না। সকল দিকেই স্ৰাহার বোধশক্তি স্ুক্্ম এবং প্রবল ছিল; রুচির বেদন। তাহার পক্ষে অল্প বেদনা নহে; ঘরে বাহিরে আমাদের অসাড়তা, শৈথিল্য, অপরিচ্ছন্নতা, আমাদের অব্যবস্থা সকল প্রকার চেষ্টার অভাব, যাহ! পদে পদে আনুম্াের.- তাক গ্রব্রিচয় দেয় তাহা! প্রত্যহই

১৬ ভগিনী নিবেদিতা;

তাহাকে তীব্র গীড়া দিয়াছে সন্দেহ নাই কিন্তু সেইখানেই তাহাকে পরাভূত করিতে পারে নাই। সকলের চেয়ে কঠিন পরীক্ষা এই ফে প্রতিমুহূর্তের পরীক্ষা, ইহাতে তিনি জয়ী হইয়াছিলেন।

শিবের প্রতিই সতীর সত্যকার প্রেম ছিল বলিয়াই তিনি অর্ধাশনে অনশনে অগ্নিতাপ সহা করিয়া আপনার অত্যন্ত সুকুমার দেহ চিত্রকে কঠিন তপস্তায় সমর্পণ করিয়াছিলেন। এই সতীও দিনের পর দিন যে তপস্যা করিয়াছিলেন তাহার কঠোরতা অসহ্য ছিল--তিনিও অনেকদিন অর্ধাশন স্বীকার করিয়াছেন, তিনি গ'লর মধ্যে যে বাড়ির মধ্যে বাস করিতেন সেখানে বাতাসের অভাবে গ্রীম্মের তাপে বীতনিত্র হইয়। রাত কাটাইয়াছেন, তবু ডাক্তার বান্ধবদেব সনিবন্ধ অনুরোধেও সে বাড়ি পরিত্যাগ করেন নাই ; এবং আশৈশব তাহার সমস্ত সংস্কার অভ্যাসকে মুহর্তে মুহূর্তে গীড়িত করিয়া তিনি প্রফুল্পচিত্তে দিন যাপন করিয়াছেন__ইহ] যে সম্ভব হইয়াছে এবং এই সমস্ত স্বীকার করিয়াও শেষ পর্যন্ত তাহার তপস্ত। ভঙ্গ হয় নাই তাহার একমাত্র কারণ, ভারতবর্ষের মঙ্গলের প্রতি তাহার প্রীতি একান্ত সত্য ছিল, তাহা মোহ ছিল না; মানুষের মধ্যে ঘে শিব আছেন সেই শিবকেই এই সতী সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। এই মানুষের অন্তর-কৈলাসের শিবকেই যিনি আপন স্বামীরূপে লাভ করিতে চান তাহার সাধনার মত এমন কঠিন সাধন আর কার আছে?

একদিন স্বয়ং মহেশ্বর ছল্সপবেশে তপংপরায়ণ। সতীর কাছে আয়া বলিয়াছিলেন, হে সাধিব, তুমি ধাহার জন্য তপস্তা। করিতেছ তিনি কি তোমার মত রূপসীর এত কৃচ্ছ,সাধনের যোগ্য ? তিনি যে দরিদ্র, বৃদ্ধ, বিরূপ, তাহার যে আচার অদ্ভুত। তপন্দিনী ক্রুদ্ধ হইয়া, বলিয়াছিলেন, তুমি যাহ বলিতেছ সমস্তই সত্য হইতে পারে, তথাপি ভাহারি মধ্যে আমার সমস্ত মন “ভাবৈকরস” হইয়া স্থিত রহিয়াছে

শিবের মধ্যেই যে সতীর মন ভাবের রস পাইয়াছে তিনি কি

রবীজ্নাথ ঠাকুর ১৭

বাহিরের ধনযৌবন রূপ আচারের মধ্যে তৃপ্তি খুঁজিতে পারেন ? ভগিনী নিবেদিতার মন সেই অনন্যহ্র্পভ সুগভীর ভাবের রসে চিরদিন পুর্ণ ছিল। এই জন্ত তিনি দরিদ্রের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখিতে পাইয়াছিলেন এবং বাহির হইতে ধাহার রূপের অভাব দেখিয়া রুচিবিলাসীরা ঘ্বণা করিয়! দুরে চলিয়া যায় তিনি তাহারই রূপে সুগ্ধ হইয়৷ তাহারই কণ্ঠে নিজের অমর জীবনের শুভ্র বরমাল্য সমর্পণ করিয়াছিলেন।

আমরা আমাদের চোখের সামনে সতীর এই যে তপস্তা দেখিলাম তাহাতে আমাদের বিশ্বাসের জড়তা যেন দূর করিয়া দেয়-__যেন এই কথাটিকে নিঃসংশয় সত্যরূপে জানিতে পারি যে মানুষের মধ্যে শিব আছেন, দরিদ্রের জীর্ণকুটারে এবং হীনবর্ণের উপেক্ষিত পল্লীর মধ্যেও তাহার দেবলোক প্রসারিত__এবং যে ব্যক্তি সমস্ত দারিদ্র্য বিরূপতা৷ কদাচারের বাহা আবরণ ভেদ করিয়া এই পরমেশ্বর্যময় পরমনুন্দরকে ভাবের দিব্য দৃষ্টিতে একবার দেখিতে পাইয়াছেন তিনি মানুষের এই অন্তরতম আত্মাকে পুত্র হইতে প্রিয় বিত্ত হইতে প্রিয়, এবং যাহা। কিছু আছে সকল হইতেই প্রিয় বলিয়। বরণ করিয়া লন। তিনি ভয়কে অতিক্রম করেন, স্বার্থকে জয় করেন, আরামকে তুচ্ছ করেন, সংস্কারবন্ধনকে ছিন্ন করিয়া ফেলেন এবং আপনার দিকে মুহুর্তকালের জন্য দৃক্পাতমাত্র করেন না।

নি.--২

নিবেদিত! জগদীশচন্দ্র বসু

নিবেদিতার মহাপ্রাণতা ত্যাগের কথা৷ আমরা ধারণা করিতে পারিব না। দেশ উপযুক্ত হইলে তাহার মূল্য বুঝিবে। কতদিন তাহার সহিত গঙ্গার ধারে বেড়াইতে বেড়াইতে দেখিয়াছি একটি পুভুল বা এক টুকরা! পাথর দেখিয়া বিহ্বল হইয়া কি সৌন্দর্য, প্রাচীন ভারতের কি গৌরৰ তাহার মধ্যে দেখিতে পাইতেন, আমরা তাহ দেখিয়া অবাক হইতাম। এই পরাধীন দেশে জন্মিয়া আমরা তাহা বুঝিতে পারি না।

নকল বিষয়ে তাহার অসামান্য প্রতিভা, গভীর জ্ঞান সুক্ষ দৃষ্টি ছিল। যাঁদ তিনি তাহার স্বদেশে যুরোপে কাজ করিতেন তবে নাম যশ অর্থ তাহার পায়ে লুটাইয়া পড়িত। সে সব ত্যাগ করিয়া প্রায় অর্ধাহারে তিনি আজীবন আমাদের দেশের জন্য তিলে তিলে প্রাণ দিলেন।

তিনি সত্যই ভারতের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন

নিবেদিতা ব্রজেন্ত্রনাথ শীল

নিবেদিত ছিলেন বিবেকানন্দের উপসংহার কিন্তু উপসংহার বলিয়৷ তিনি ঠিক বিবেকানন্দের প্রতিরূপ ছিলেন না। নিবেদিতার জীবনের সামান্তমাত্রও স্পর্শ ধাহারা পাইয়াছিলেন, তাহারাই জেই জ্যোতির্ময় জীবনের বিশালতা, গভীরতা শক্তিসঞ্চার দেখিয়া মুগ্ধ হইতেন। একটি ছুর্মভ সর্বতোমুখী ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎ আমর! পাই নিবেদিতার মধ্যে। নিবেদিতার চরিত্রে এবং চিন্তায় দেখিয়াছি ভারতীয় ভাবধারা এবং সাস্কৃতিক মহিমার সহিত আধুনিক ভাবধারাও উজ্জলরূপে ফুটিয়৷ উঠিয়াছিল। ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ ন! করিয়াও নিবেদিতা ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন__ইহা। তাহার পক্ষে কম গৌরবের কথা নহে। ভারতের শিক্ষা কি) সাধনা! কি, সমাজের মর্নকথা কি, তাহা তিনি তেমন করিয়াই বুঝাইতে চাহিয়াছেন যেমন করিয়া! বুঝিলে আমরা! যথার্থ ভারতীয় হইয়া উঠিতে পারি_-এক বিদেশিনীর পক্ষে ইহা! কম কৃতিত্বের কথা নহে।

নিবেদিতা অবলা বস্থু

কিছুকাল আগে নিবেদিতা বিদেশে আমার রোগশব্যাপার্থে থাকিয়! শুশ্রাা করিয়াছিলেন আজ আমার পালা আমাদের সকলেরই আশা ছিল তিনি আরোগ্যলাভ করিবেন, কিন্ত তিনি বোধ হয় বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে অস্তিম-মুহুর্ত আসিয়া গিয়াছে প্রতিদিন প্রাতঃকালে নিবেদিতা আমাদিগকে সহাস্ত বদনে অভ্যর্থনা করিতেন, কথা যাহা বলিতেন তাহার মধ্যেই তাহার চিত্তের নিভাঁকতার পরিচয় পাইতাম সব সময়েই ভারতের মেয়েদের শিক্ষার কথা ভাবিতেন, আলোচন। করিতেন তাহার জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, পুস্তকের যাবতীয় আয়__এ সবই তিনি ভারতের সেবায় উৎসর্গ করিয়াছিলেন দাঞজিলিউ-এ আসিবার কয়েকদিন পূর্বে নিবেদিতা প্রাচীন বৌদ্ধধর্ম হইতে একটি প্রার্থন! বাণী অনুবাদ করিয়াছিলেন এবং উহা! মুত্রিত করাইয়! তাহার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে বিতরণ করিয়াছিলেন। সম্ভবত: তিনি জানিতে পারিয়াছিলেন ইহাই তাহার বিদায়-বাণী। ভগিনী নিবেদিতার সমগ্র জীবনই ছিল প্রার্থনা" ..*."উমাহৈমবতীর যে উপাখ্যান তিনি আমাদের নিকট জীবন্ত ভাষায় বর্ণনা করিয়াছিলেন, নিবেদিতার মৃত্যুশষ্যাপার্্বে বসিয়া সেই উপাখ্যানটি আমার বার বার মনে পড়িতেছিল। এই শরৎ খতুতেই তো উমা পিত্রালয়ে আসিয়া থাকেন। আমার সম্মুখই তো আর একটি উমাকে দেখিতেছি, যিনি বহু জন্মের পরে তাহার নিজ আবাস ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসিয়াছেন।******তারপর অন্তিম-মুহূর্তে নিবেদিতার হইতে যখন অক্ফুটম্বরে উচ্চারিত হইল £ অসতো। মা সদগময়১ তমসো ম। জ্যোতির্ময়, মৃত্যোর্মীম্বতং গময়, আবিরাবীর্ম এধি। রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম্‌॥ তখন দেখিলাম তাহার সমস্ত মুখখানি একটি দিব্যজ্যোতিতে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। নিমীলিত নয়নে নিবেদিত। ভারতের ধ্যানে ডুবিয়া গেলেন।

নিবেদিতার সঙ্গে বুদ্ধগয়ায় যছুনাথ সরকার

সন্ধ্যাকালে আমরা সকলেই বোধিবৃক্ষের নীচে বসিয়া! ধ্যান কবিতাম। বুদ্ধদেব যে বোধিবৃক্ষের নীচে বসিয়া আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে নির্বাণ লাভ করিয়াছিলেন, বৃক্ষটি তাহারই বংশধর। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে ইহার একটি শাখা সিংহলে লইয়া গিয়। সেখানকার রাজ। তথায় প্রোথিত করেন। অল্প কিছু দূরে একখানি গোলাকার প্রস্তরথণ্ড ছিল, তাহার উপরে একটি বনজ খোদিত ছিল। কথিত আছে, এই বস্তরটি স্বয়ং ইন্দ্র বুদ্ধদেবকে দিয়াছিলেন। এই বজ্রটি দেখিয়া নিবেদিতা বলিলেন, ইহাকে ভারতের জাতীয় চিহ্নম্বরূপ গ্রহণ করা কর্তব্য। আমরা সকলে ইহার অর্থ জানিতে চাহিলে নিবেদিতা বলিলেন, ইহার অর্থ এই যে, যখন কেহ সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্ নিজের যথাসবন্ব ত্যাগ করেন, তখন তিনি এই বজ্রের মতই শক্তিশালী হইয়া দেবতাদের নির্দিষ্ট কার্ধ করেন। এই জন্যই বোধ হয় নিবেদিতা৷ এই বজ্ব-চিহৃকে তাহার পুস্তকের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং সেই একই কারণে বস্থ-বিজ্ঞান-মন্দিরের শীর্ষদেশে জগদীশচন্দ্র এই বজ্ব-চিহ্ন স্থাপন করেন

সন্ধ্যাবেলা1 নিবেদিতা, রবীন্দ্রনাথ এবং আমরা একত্রে বাহির হইতাম। সুজাত৷ বুদ্ধদেবকে সোনার থালায় করিয়া পায়েস খাইতে দিয়াছিলেন। স্থুজাক্চার পায়েস ভক্ষণ করিয়াই বুদ্ধ নির্বাণ লাভ করেন। সুজাতার বাঁড়ি ছিল উরুবেলা গ্রামে। একদিন বেড়াইতে বেড়াইতে আমরা একটি গ্রামে গিয়া পৌছিলাম। গ্রামটিকে এখন উল বলা হয়। নিবেদিতা বলিলেন, এই গ্রামেই সুজাতা বাস করিতেন। উৎসাহ আনন্দের আতিশয্যে নিবেদিতা সেই

২২ নিবেদিতার সঙ্গে বৃদ্বগয়ায়

গ্রামের কিছু মৃত্তিকা তুলিয়া লইলেন এবং বলিলেন, স্থজাতার গ্রামের মৃত্তিকা! পবিত্র। নিবেদিত ভারতের বহু তীর্থ ভ্রমণ করিয়াছেন, এবং এই তীর্ঘগুলির নৃতন ব্যাখ্য। দিয়াছেন। আমরা যে মোহস্তের বাড়ি উঠিয়াছিলাম, সেইখানে প্রতিদিন

নিবেদিতা আমাদের সকলকে ওয়ারেন-এর বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত বই হইতে এবং এড উইন অরর্ণন্ডের লাইট অব এশিয়া' হইতে কবিতা! পড়িয়া শুনাইতেন। একদিন সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকারে আমরা সকলে যখন বোধিবৃক্ষ তলে গিয়া বসিলাম, তখন লক্ষ্য করিলাম একটি আশ্চর্ষ-চরিত্রের মানুষকে তাহার নাম ফুজী। একজন দরিদ্র জাপানী সে। দীর্ঘকাল ধরিয়া সে কণ্ঠ করিয়া পয়সা জমাইয়াছে তাহার জীবনের একটি স্বপ্র চরিতার্থ করিবার জন্য ভগবান তথাগত যে স্থানটিতে বুদ্ধত্ব লাভ করেন, ফুজীর ইচ্ছা, সেই পুণ্য তীর্থস্থানটি সে একবার দর্শন করিবে। অবশেষে সে এইখানে আসিয়া পৌছিয়াছে এবং যাত্রীনিবাসের একটি ঘরে অতি সামান্তভাবে সে থাকে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফুজী আসিয়া বোধিবৃক্ষ তলে বসিয়। এই স্তোত্রটি পাঠ করিত £

নমেো। নমো বুদ্ধদিবাকরায়

নমো নমো গোতমচন্দিমায়,

নমো নমোনভ্তগুণঞরবায়,

নমে। নমো সাকিয়নন্দনায়।

সন্ধ্যার সেই নিস্তব্ধ শান্ত মুহূর্তে জাপানী কণ্ঠে এই সংস্কৃত .

স্তোত্রটি যেন মন্দিরের সুমধুর ঘণ্টাধ্বনির মত শুনাইত। নিবেদিতা সযত্বে ফুজীকে প্রতিদিন আহার্য দ্রিতেন। ফুজীর কণ্ঠে উচ্চারিত এই স্তোত্রটি রবীন্দ্রনাথের মনে ছিল। তাহার 'নটার পূজায় শ্রীমতীর প্রার্থনায় কবি এই ফুজীর স্মৃতিকে অমর করিয়া রাখিয়াছেন।

নিবেদিতা প্রসঙে মতিলাল ঘোষ

ভগিনী নিবেদিতাকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতাম। তিনি সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্রী ছিলেন। তাহার মহৎ চরিত্রের গুণেই তিনি ইহা৷ অর্জন করিয়াছিলেন। তিনি সকলেরই ভগিনীসমা ছিলেন। তাহার হৃদয়ের স্নেহ কেবলমাত্র বাগবাঁজারের অধিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না! ,কিংব। কলিকাতা বা ভারতবর্ষেব মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না__-উহা! সমগ্র পৃথিবীতে ব্যান্ত হইয়াছিল। তবে বাগবাজারের অধিবাসীদ্িগের নিকট তাহার স্মৃতি বিশেষভাবে পবিত্র এই কারণে যে, এই অঞ্চলেই ছিল তাহার কর্মক্ষেত্র এবং দীর্ঘকাল যাবৎ তিনি এইখানকার অধিবাসীদের সুখ-দুঃখের সমভাগিনী ছিলেন এবং তাহার নিরলস সেবার দ্বারা তিনি সকলের চিত্ত জয় করিয়াছিলেন

পর্তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করিয়া কেবলমাত্র স্েহময়ী জননী অথবা! ভগিনীরূপে রুগ্ন গীড়িতের সেবা করিতেন না-সে কলেরা কিংৰা প্লেগের দ্বারা আক্রান্ত হউক ন। কেন- কিম্বা আত্মীয়স্বজন বা বান্ধবহীন অনাথ বা বিধবার যে তিনি ছুঃখমোচন করিতেন তাহা নহে_-সকলের জন্যই তাহার হৃদয় উন্ুক্ত ছিল। তাহার মুখের হাসি হইতে কেহই বঞ্চিত হইত না এবং করুণা তো। সকলেই পাইত। নিবেদিতা যেন নারীকুলে সম্রাজ্ঞী বিশেষ ছিলেন। মানবী আকারে তিনি ছিলেন দেবী _যিনি ছুঃখযন্ত্রণীক্ষুব্ধ এই মানব-সমাজে সুখ শাস্তি আনিবার জন্য স্বর্গ হইতে নামিয়া। আসিয়াছিলেন। জাতিধর্ম নিবিশেষে তিনি সকলের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করিয়াছিলেন,” হিন্দুধর্মের সব কিছুই তিনি ভালবাসিতেন, তবে অন্ধ অনুরাগবশতঃ নহে, স্বাধীন বিচ'রশক্তির ভিতর দিয়াই তিনি এই অমাজের সহিত একাত্ম হইয়। গিয়াছিলেন। তিনি শুধু বিদ্ষী ছিলেন না, অসামাস্তা!

২৪ নিবেদিতা প্রসঙ্গে

বুদ্ধিশালিনীও ছিলেন। হিন্দুর সামাজিক বিধি-বিধানের মধ্যে তিনি যে সৌন্দর্যের পরিচয় পাইয়াছিলেন, তাহা উচ্ছাস বা অন্ধ অনুরাগ- বশতঃ নহে, তন্ন তন্ন করিয়া অনুশীলন করিবার ফলেই। পাশ্চাত্য জগতের নিকট নিবেদিতা যেভাবে ভারতবর্কে তুলিয়। ধরিয়াছিলেন, একমাত্র সেই কারণেই তাহার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার খণ অপরিশোধনীয়।

ভারত-কন্তা নিবেদিতা রাসবিহারী ঘোষ

নিবেদিতা ছিলেন বিদ্ধী এবং উন্নত চরিত্রের মহিলা বিদেশ হইতে এই দেশে আসিয়া এই দেশকেই তাহার জন্মভূমি জ্ঞান কয়িয়া- ছিলেন এবং অবশেষে এই দেশের মৃত্তিকীতেই তাহার অন্তিম শয্য। গ্রহণ করিয়াছেন স্বামী ব্রিবেকানন্দের শিল্যা হইয়া ভগিনী নিবেদিত ভারতবর্ষে আসিয়াছিলেন এবং আচারে ব্যবহারে কথাবার্তায় তাহার মধ্যে নিষ্ঠাবতী হিন্দ-রমণীর ভাৰ এমন ভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছিল, যাহা! দেখিয়া মনে হইত সত্যই তিনি যেন পুর্ধজন্মে ভারতের কন্যা! ছিলেন। নিজেকে তিনি সর্বতোভাবে ভারতের কল্যাণে উৎসর্গ করিয়া দিয়া তাহার গুরুর দেওয়! সুন্দর নামটিকে সার্থক করিয়া গিয়াছেন। ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ধর্মের প্রতি আজ যে আমরা! এত অনুরাগী হইয়া উঠিয়াছি, ইহার কারণ ভগিনী নিবেদিতা ইহার শুক্ষ অস্থিপঞ্জরে প্রাণ সঞ্চার করিয়া! আমাদের সম্মুখে ইহা তুলিয়া ধরিয়া" ছিলেন। তিনি যদি আর কিছু না করিয়া যাইতেন তাহা হইলেও আমর! ইহার জন্যই নিবেদিতার নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকিতাম

তিনি হিন্দুধর্সকে অন্তরের শ্রদ্ধা দিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলেন। ব্রত যাপনের মত তিনি জীবন যাপন করিয়া গিয়াছেন। আমরা সেই জীবনের মূল্য বুঝি নাই, মূল্য দিই নাই। প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মিলনের রাহী ছিলেন নিবেদিতা এবং স্বামী বিবেকানন্দ এই সম্পর্কে তাহার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করিয়া গিয়াছিলেন, ভগিনী নিবেদিতা তাহা যোগ্যতার সহিত, আন্তরিকতার সহিত পালন করিয়া গিয়াছেন। এমন গভীর ভারতঞ্রীতি কোনো! বিদেশীর মধ্যে দেখি নাই। কিন্তু নিবেদিতাকে বিদেশিনী বলিতে আমার বাধে আমার “তে মনে হয় তিনি ভারতীয়দের অপেক্ষা বেশী ভারতীয় ছিলেন

২৬ ভারত-কন্তা নিবেদিতা

শিক্ষায়, দীক্ষায়, সেবায়, বিজ্ঞানে, রাজনীতিতে-_-সকল ক্ষেত্রেই আমরা তাহাকে পাইয়াছিলাম।

নিবেদিত আজ নাই, কিন্তু তাহার জীবনব্যাপী কর্ণ কাঁত্তির মধ্যে তিনি বাঁচিয়। থাকিবেন। তিনি বাঁচিয়। থাকিবেন তাহার অজত্র রচনার মধ্যে। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে তিনি যাহ। লিখিয়া গিয়াছেন তাহা অপেক্ষা সুন্দর রচনা আমি খুব কমই পাঠ করিয়াছি। যদি কোন ফুলের সৌন্দর্যের সহিত নিবেদিতার অন্তরের সৌন্র্ষের তুলন! দিতে হয়, তাহ। হইলে সর্বাগ্রে যে-ফুলটির নাম আমার মনে আসে তাহ! হইল শ্বেতপদ্ন। শ্বেতপন্মের মতই শুভ্র পবিত্র ছিল তাহার আকৃতি প্রকৃতি। তিনি পবিত্রতার মতই পবিভ্র--যেন মৃত্তিমতী পবিত্রতা আমাদের সৌভাগ্য যে, নিবেদিতাকে আমরা পরমাত্বীয়া- রূপে আমাদের মধ্যে পাইয়াছিলাম। ভারতের জাতীয় পুনরুখানের ইতিহাসে “নিবেদিতা” এই নামটি চিরম্মরণীয় হইয়া থাকিবে।

নিবেদিতা-রামানন্দ প্রসঙ্গে সীতা দেবী

ভাগনী নিবেদিতার সহিত রামানন্দবাবুর বন্ধুত্ব কর্মক্ষেত্রে যোগ কলিকাতায় আসার পর আরে! ঘনিষ্ঠ হয়। প্রায়ই দেখা যাইত প্রবাসী” অফিস হইতে ছৰি কিং! প্রবন্ধের প্রুফ লইয়া কেহ তাহার সেই বোসপাড়া লেনের ক্ষুদ্র বাঁড়িতে চলিয়াছে।

“ভগিনী নিবেদিতা তাহার প্রবন্ধ কাহাঁকেও সংশোধন করিতে দিতেন না। ভগিনী নিবেদ্িতার নিকট ধাহার! কাজ লইয়া যাইতেন তাহাদেরও তিনি শুধু পত্রবাহক হিসাবে দেখিতেন না। রামায়ণ মহাভারত সম্বন্ধে তাহাদের কতটা জ্ঞান, দেশের 'বিষয় তাহার! কিছু জানেন কিনা সব খোঁজ লইতেন। যদি দেখিতেন হিন্দুর ছেলে হইয়াও হিন্দুর মহাকাব্য সম্বন্ধে ইহারা তেমন কিছু জানেন না, তাহ হইলে ভগিনী নিবেদিত। চটিয়া যাইতেন।

রামানন্দবাবু প্রায়ই নিবেদিতার বোসপাড়া লেনের বাড়িতে এবং কখনো বা জোড়াসীকোর অবনীন্্রনাথের বৈঠকে নিবেদিতার সহিত নানাবিধ আলোচনা করিতেন। ডাঃ জগদীশচন্দ্র বস্থুর গৃহেও ই'হাদের নানা! প্রসঙ্গ হইত। বাঙালীদের পোশাক-পরিচ্ছদ জীবনযাত্রা সবের মধ্যেই নিবেদিতা যে সৌন্দর্যের সন্ধান করিতেন ইহা তাহাদের কথোপকথন হইতে বুঝা যাইত।

প্রবাসী'র প্রথম বসরই অজন্তা গুহ! বিষয়ে নিবেদিতা সচিত্র প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন এবং ক্রমে অবনীন্দ্রনাথ প্রভৃতি অগ্রগামী শিল্পীদের চিত্রে কাগজ অলঙ্কত করিতে থাকেন। অজন্তা গুহার চৈত্য বিহাঁরগুলির সম্বন্ধে তিনি প্রবাসীতে ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন

একদিন গীড়িত রামানন্দবাবুকে তিনি দেখিতে আদিলেন ।'

২৮ নিবেদিতা-রামাননদ প্রসজে

সুদীর্ঘ, শুভ্র পরিচ্ছদ বিলাতি জুতা পরিয়া তিনি আসিয়াছিলেন। রোগীর ঘরের সামনে আসিয়াই জুতা জোড়! খুলিয়! রাখিলেন। যুরোগীয় মহিলাকে জুতা৷ খুলিতে দেখিয়া সকলে ব্যস্ত হইয়। উঠিতেই নিবেদিতা ইংরেজিতে বলিলেন--আমি জানি, জুতা খুলিতে হয়।»..*তিনি “মডার্ণ রিভিয়ু'র জম্মকাল হইতেই (১৯০৭) লেখা দিয়া অন্ান্ত উপায়ে সম্পাদককে যেরূপ সাহাব্য করিয়াছিলেন, তেমন সাহায্য সচরাচর কাহারও নিকট মিলে না। রামানন্দবাবু বলিতেন যে, নিবেদিতা সাধারণ কথাবার্তার সময় সম্পাদকের কাজের দৌষক্রটী যাহা দেখিতেন, তাহার কঠোর সমালোচন! করিতেন। সেই সমালোচনাও কম মূল্যবান ছিল ন]। নিবেদিত৷ প্রকৃতই তাহার ভগিনী ছিলেন এবং নিবেদিতার জীবন- পথে ধীহারা তাহার নিকটে আসিয়াছিলেন তাহাদের সকলের কাছেই নিবেদিত! সত্যই আপনাকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করিয়া- ছিলেন। নান] বিষয়ে প্রবন্ধ লিখিবার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাহার

প্রথম সাক্ষাতের স্ৃতি বিপিনচন্দ্র পাল

১৯১০ আলে মিস্‌ নোৌবলের [ ভগিনী নিবেদিতা ] সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। সে অদ্ভুত পরিচয়। আমাদের পরস্পরের সঙ্গে দেখা হইলেই একটা ঝগড়া পাকাইয়া উঠিত অথচ আশ্চর্যের কথা এই যে, এই ঝগড়ার দরুণ উভয়ের“মধ্যে কাহারও মনে এক মুহূর্তের জন্যও বোধ হয় কোন বৈরি ভাব লেশমাত্র জাগে নাই। সকল ঝগড়ার ফলে আমাদের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের শ্রদ্ধারও কোন ব্যাঘাত কখনও জন্মে নাই। সেই প্রথম পরিচয়ের কথা মনে করিয়াই নিবেদিতার গোটা ছবিট। চোখের উপর ভাসিয়! উঠিতেছে।

আমি ত্রান্ম-সমাজের লোক, নিবেদিতা ইহ! জানিতেন। আর ব্রাহ্ম-সমাজের প্রতি তাহার একটা গভীর অশ্রদ্ধা ছিল। নিবেদিতার, সুস্থচিত্তে কখনও কোন মনোভাব ঢাক। থাকিত না। সুতরাং সৌজন্যের খাতিরেও আমার সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়ের দিনে তিনি তাহার অন্তরের অশ্রদ্ধা গোপন করিতে পারিলেন না। একেবারে সোজাস্থৃজি আমাকে লক্ষ্য করিয়! ব্রাহ্ম-সমাজকে আক্রমণ করিলেন বলিলেন,__ব্রাহ্ম-সমাজের লোকেরা, বিশেষতঃ মেয়েরা অত্যন্ত বিকৃত হইয়। পড়িতেছেন |”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি ব্রাহ্মমেয়েদের সঙ্গে মিশিয়াছেন ত?

নিবেদিতা ; হ্যা।

আমি: মিসেস পি. কে. রায়কে চেনেন?

নিবেদিতা: চিনি। অমন মেয়ে অতি অল্লই দেখিয়াছি

আমি: মিসেস জে. সি. বোসকে চেনেন?

নিবেদিতা : মিসেস বোস রমণীর শিরোমণি

১৩৩ প্রথম সাক্ষাতের স্থতি

আমি : এদের ছোট বোনকে জানেন?

নিবেদিতা : সি ইজ লাভলি।

আমি: শিবনাথ শান্ত্রীর মেয়েকে দেখেছেন--মিসেস সরকার ?

নিবেদিতা : হ্যা, দেখেছি সী ইজ ভেরি গুড।

আমি: আপনি বোধ হয় জানেন, এর। সকলেই ব্রাহ্ম-মেয়ে।

এইখানেই প্রথম পাল! শেষ হইল। পরদিন সন্ধ্যায় আমাদের উভয়ের সংগ্রামের তৃতীর পালার অভিনয় হয়।:..

সেদিন মিসেস বুল বোষ্টনের স্কুল সমূহের শিক্ষযিত্রীদিগকে তাহার বাটিতে চা খাইবার নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন প্রায় ছুই-তিন শত শিক্ষয়িত্রী এই উপলক্ষে মিসেস বুলের বাড়ীতে সমবেত হন। কিছুক্ষণ ঘুরিয়া ফিরিয়া ক্লান্ত হইয়া আমি একটা ঘরে একপাশে আসিয়া বসিয়া পড়িলাম। দৈবছরিপাকে সে ঘরে নিবেদিতা অনেকগুলি শিক্ষয়িত্রীর নিকটে ভারতবর্ষের কথা কহিতেছিলেন। আমি নীরবে বসিয়া তাহার কথা শুনিতেছিলাম। ক্রমে জাতিভেদের কথা উঠিল। নিবেদিতা জাতিভেদের পক্ষ সমর্থন করিতে লাগিলেন। এই সময় আমার উপর তাহার চোখ পড়িল। আমাকে নির্দেশ করিয়া কহিলেন, “এ মিঃ পাল বসিয়া আছেন। ত্রাহ্মরা সাতিভেদ মানেন ন1 এবং স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি তাহাদের ভক্তি অপরিমিত নয়। মিঃ পালও জাতিভেদ মানেন না এবং সনাতন ধর্মের উপর

তাহার আস্থা নাই তখন সকলের চোখ আমার উপরে পড়িল। অবস্থায় আমার

নীরব থাকা অসম্ভব হইল।

আমি কহিলাম--জাতিভেদ সম্বন্ধে বিদেশীয়দিগের একটা ভূল ধারণা আছে সেটা এই ফে, এই জাতিভেদ আছে বলিয়াই ভারতবর্ষ রা্্ীয় স্বাধীনতা লাভ করিতে পারিতেছে না; এবং যতদিন এই জাতিভেদ উঠিয়া না যাইবে, ততদিন ভারতবর্ষের লোক এক জাতিতে পরিণত হইয়া! আত্মশাসনের অধিকার লাভ করিতে পারিবে

বিপিনচন্ পাল ৩১

না। এই কথাটা! নিতান্তই ভুল। জাতিভেদ থাক। বা ন! থাকার উপরে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা কিছুতেই নির্ভর করে না। আমাদের দেশে জাতিভেদ আছে। ইংলগ্ আমেরিকায় শ্রেণীভেদ সাজ্ঘাতিক আকারে বিদ্ধমান রহিয়াছে। সুতরাং ইংলও আমেরিকার শ্রেণীভেদ থাকা সত্বেও যেমন রাষ্রীয় স্বাধীনতার কোন সাজ্ঘাতিক ব্যাঘাত উপস্থিত হয় নাই, সেইরূপ ভারতে জাতিভেদ আছে বলিয়! জাতীয় স্বাধীনতা লাভ